
সাংবাদিকতার মূল কাজ ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা; অন্যায়, বৈষম্য ও জবাবদিহিহীনতা সামনে আনা। মোবাইল সাংবাদিকতা সেই কাজকে আরও দ্রুত, বিস্তৃত ও জনমুখী করার শক্তিশালী হাতিয়ার হওয়ার কথা ছিল। হাতে স্মার্টফোন থাকলে ঘটনাস্থল থেকেই তাৎক্ষণিক ছবি, ভিডিও ও তথ্য পাঠানো যায়—যেখানে বড় ক্যামেরা পৌঁছায় না, সেখান থেকেও খবর তুলে আনা সম্ভব।
কিন্তু বাংলাদেশে এই সম্ভাবনাময় মাধ্যমের এক অস্বস্তিকর ও কদর্য ব্যবহার ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। বহু ক্ষেত্রে মোবাইল সাংবাদিকতা আর সংবাদ সংগ্রহের মাধ্যম নেই; বরং তা মানুষের, বিশেষ করে নারীদের, প্রকাশ্যে হেনস্তা ও অপমানের কনটেন্টে পরিণত হয়েছে।
চিত্রটি খুব পরিচিত। কোনো নারী জনসমাগমে আছেন—হয়তো শাড়ি ঠিক করছেন, ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, কিংবা হাঁটছেন। হঠাৎ একটি ফোন ক্যামেরা তাকে ‘খবর’ বানিয়ে ফেলে। অনুষ্ঠান নয়, ঘটনাও নয়—ফোকাস কেবল সেই নারী। এরপর শুরু হয় ভিডিও, রিল, ইঙ্গিতপূর্ণ ক্যাপশন, ঠাট্টা, লজ্জা—আর ভেসে ওঠে তথাকথিত ‘সংবাদ’। এটি সাংবাদিকতা নয়; এটি অপমানের বাণিজ্য।
সমস্যা ক্যামেরায় নয়, ব্যবহারে। ক্যামেরা তথ্য তুলে ধরার বদলে যখন কারও অপ্রস্তুত মুহূর্তকে উন্মুক্ত করে, যখন প্রেক্ষাপটের বদলে শরীর বা ভঙ্গিকে সামনে আনা হয়—তখনই একজন মানুষ কনটেন্টে পরিণত হন।
এই প্রবণতার বড় চালক কিছু ফেসবুক পেজ, টিকটক অ্যাকাউন্ট, ইউটিউব চ্যানেল ও ভুঁইফোড় ‘নিউজ পোর্টাল’। তারা অপমানকে বিক্রির জিনিস বানিয়েছে। আরও উদ্বেগজনক হলো—মাঝে মাঝে কিছু প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমও এই ফাঁদে পা দিচ্ছে। জনস্বার্থহীন, কৌতূহলনির্ভর ক্লিপ প্রকাশ করে তারা নিজেদের মানদণ্ডকেই দুর্বল করছে।
একটি পেজ নামের শেষে ‘টিভি’, ‘নিউজ’ বা ‘মিডিয়া’ জুড়লেই সাংবাদিকতা হয় না। মানুষের দুর্বল মুহূর্ত ভাইরাল করা জনস্বার্থ নয়। কারও লজ্জা বা অস্বস্তিকে কনটেন্ট বানানো সংবাদ নয়।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে এক নারী আন্দোলনকর্মীকে আপত্তিকরভাবে ভিডিও করার অভিযোগে এক মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিককে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। মুচলেকায় তিনি স্বীকার করেন, অপ্রয়োজনীয়ভাবে জুম করে ফুটেজ নিয়েছিলেন। এই ঘটনা ব্যক্তিগত ভুলের চেয়ে বড়—এটি দেখায়, সমস্যা পেশার ভেতরেই ঢুকে পড়েছে।
একই প্রবণতা দেখা যায় পুলিশের চেকপোস্ট বা অভিযানে। মানুষকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় ভিডিও করা হয়, পরিচয় ফাঁস করা হয়, আদালতের আগেই সামাজিক মাধ্যমে ‘রায়’ দিয়ে দেওয়া হয়। এটি স্পষ্টতই মিডিয়া ট্রায়াল।
এটি শুধু নারীর মর্যাদার প্রশ্ন নয়; এটি আইনের প্রশ্নও। দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো নারীর শ্লীলতাহানি বা গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ খুবই দুর্বল। রাজনৈতিক স্বার্থে যেখানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেখানে সাধারণ মানুষের মর্যাদা রক্ষায় সেই তৎপরতা প্রায় অনুপস্থিত।
নিবন্ধিত গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায় আরও বেশি। নিবন্ধন মানে দায়িত্বও। অপব্যবহার হলে সতর্কবার্তা, জবাবদিহি, এমনকি শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে। আর অনিবন্ধিত ভুঁইফোড় পেজগুলোর ক্ষেত্রেও রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না—দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, কনটেন্ট অপসারণ ও পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের শনাক্ত করা জরুরি।
এই সংস্কৃতি শুধু নারীদের নয়, সাংবাদিকতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিবার অপমান ‘মিডিয়া’ নামে প্রচারিত হলে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়ে যায়।
এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়। কাউকে শিকারি ক্যামেরার সামনে ঠেলে দেওয়া স্বাধীনতা নয়—এটি নিপীড়ন। বরং এমন শিকারি লেন্স থেকে মানুষকে রক্ষা করাই নাগরিক মর্যাদা রক্ষার শর্ত।
মিডিয়ার নামে এই অপসংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিলে, সাংবাদিকতা নিজেই সেই সমস্যার অংশ হয়ে উঠবে—যা উন্মোচন করার কথা ছিল তারই। (op-ed স্টাইল)লেখক: দ্য ডেইলি স্টারের একজন সাংবাদিক, যিনি শিক্ষা, সুশাসন, মানবাধিকার ও জনজবাবদিহিতা নিয়ে লেখালিখি করেন।
arafat.mcj@yahoo.com
Leave a Reply