Dhaka 7:45 pm, Friday, 30 October 2026

পাবনা সুগার মিল: বন্ধ কারখানায় মাসে অপচয় ১৪ লাখ টাকা, কাজ না করেই বেতন নিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা । 

  • Reporter Name
  • Update Time : 12:02:14 pm, Friday, 30 October 2026
  • 6 Time View

পাবনা প্রতিনিধি

পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান হলো পাবনা চিনি কল লিমিটেড । এটি অবস্থিত পাবনা-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের পাকুড়িয়া মৌজার কালিকাপুরে । ১৯৯২ সালের ২৭ ডিসেম্বর সরকারি উদ্যোগে মিলটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৭ সালে এর প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হয়।

১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে এটি বাণিজ্যিকভাবে চিনি উৎপাদন শুরু করে। এর প্রধান যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ছিল পাকিস্তানের এইচএমসি লিমিটেড । বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশ আওতায় পাবনা সুগার মিলের মোট জমির পরিমাণ ৬০ একর এর মধ্যে কারখানা ২৭ একর, আবাসিক ও অন্যান্য ১৮ একর এবং রাস্তা ও লেগুন ১৫ একরের ওপর প্রতিষ্ঠিত । এই শিল্প কমপ্লেক্সের মধ্যে চিনিকল ছাড়াও বাণিজ্যিক খামার, জৈব সার কারখানা, অফিস এবং আবাসন ভবন রয়েছে। মিলটির দৈনিক আখ মাড়াইয়ের ক্ষমতা ১,৫০০ মেট্রিক টন। বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ছিলো ১৫,০০০ মেট্রিক টন চিনি। উৎপাদিত প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে চিনি। এ ছাড়া উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে চিটাগুড় ব্যাগাস ও প্রেসমাড উৎপাদিত হতো । পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঁচামাল বা আখের ঘাটতি, পুরনো যন্ত্রপাতি এবং নানা ধরনের আর্থিক লোকসানের কারণে ২০০৯ সালে মিলটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে মিল চালুর সুনির্দিষ্ট সময়ে স্থানীয় ইক্ষু চাষিদের আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করতে ঋণ প্রদান ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো ।

বারবার আশ্বাস আর ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে পাবনা সুগার মিল চালুর উদ্যোগ। ঐতিহ্যবাহী এই চিনি কলটি চালুর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের একাধিক বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতির পর দীর্ঘদিন পার হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে অনিশ্চয়তা আর হতাশার প্রহর গুণছেন আখচাষি ও হাজারো শ্রমিক-কর্মচারী।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে দীর্ঘদিন ধরে মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মিলের কোটি কোটি টাকা মূল্যের মূল্যবান যন্ত্রপাতি খোলা আকাশের নিচে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এতে রোদ-বৃষ্টিতে জমে থাকা ভারী যন্ত্রপাতিগুলোতে জং ধরে ধীরে ধীরে তা অকার্যকর হতে চলেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত এই চিনিকল চালু করা না হলে অথবা পড়ে থাকা সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও অহেতুক ব্যয় রোধ না করা হলে সরকারের এই বিশাল প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে ।

 

এক সময় যা ছিল ঈশ্বরদী ও দাশুড়িয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু, তা এখন এক নীরব ভূতুড়ে চত্বরে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় চাষিরা জানান, মিলটি বন্ধ হওয়ার পর তারা মারাত্মক আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন। চিনি কল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আখ চাষ ছেড়ে তারা বাধ্য হয়ে বিকল্প ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। তবে বিকল্প ফসলে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পাওয়ায় মিলটি পুনরায় চালু করার দাবি তাদের দীর্ঘদিনের।

পাবনা সুগার মিলের শ্রমিক নেতারা জানান বিভিন্ন সময়ে সুগার মিলটি চালুর আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো কাজ বা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। মিলটি চালু হলে এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ফিরত এবং স্থানীয় অর্থনীতি আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। কৃষিবিদ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সময়মতো সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর আধুনিকায়ন ছাড়া কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সুগার মিলটি পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে। মিলটি পুনরায় চালু করতে হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, আখচাষিদের প্রয়োজনীয় ঋণ ও প্রণোদনা দেওয়া এবং বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে চালুর কোনো বাস্তব পদক্ষেপ না থাকায় স্থানীয় আখচাষি, শ্রমিক ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অনতিবিলম্বে কথা না দিয়ে কাজের মাধ্যমে দ্রুত পাবনা সুগার মিল সচল করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের বৃহৎ শিল্প-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর নীতিগত ঘোষণা ও উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়ায় অবস্থিত পাবনা সুগার মিলস লিমিটেডের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। চালুর প্রতিশ্রুতি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় ক্ষোভ ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণ। অন্যদিকে, মিলের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকলেও প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাহারার নামে সরকারের কোষাগার থেকে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।প্রতিষ্ঠানটি থেকে জানা যায়, চিনি উৎপাদন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও মিলের প্রশাসনিক ও রক্ষাণাবেক্ষণের কাজে বর্তমানে ২৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২৬ জন নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োজিত রয়েছেন। এই ৫২ জন জনবলের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে সরকারকে প্রায় ১৪ লক্ষ টাকা ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। কোনো আয় ছাড়া এভাবে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টিকে স্থানীয় সচেতন মহল অযৌক্তিক এবং সরকারি অর্থের অপচয় হিসেবে দেখছেন। এ ছাড়াও

স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিরাপত্তা প্রহরীর খাতায় নাম অন্তর্ভুক্ত রেখে কোনো দায়িত্ব পালন না করেই দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছেন তাদের স্থানীয় দলীয় পদ পদবী রয়েছে ।

নিরাপত্তা প্রহরীদের বেতন ও ভাতার বিষয়ে জানতে চাইলে পাবনা সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান জানান আমাদের নিরাপত্তা প্রহরীর সেবাটি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এইড সিকিউরিটি সার্ভিস (প্রাঃ) লিমিটেড, রাজশাহী’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোট ২৬ জন নিরাপত্তা প্রহরীর বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়ে থাকে। চুক্তি অনুযায়ী টাকা আমরা ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করি। এখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যদি স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সিকিউরিটি ডিউটিতে রাখে বা তাদের বেতন দেয়, তার দায়ভার আমাদের নয়।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ‘এইড সিকিউরিটি সার্ভিস (প্রাঃ) লিমিটেড’-এর পরিচালক শাহিদ আলী শান্তর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। এ দিকে বন্ধ চিনিকলগুলো আধুনিকীকরণ ও পুনরুজ্জীবিত করার বিভিন্ন সময় ঘোষণা আসলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া সুগার মিলটিতে দেখা যায়নি। সরকারের উদ্যোগের কথা শুনে শ্রমিক ও কৃষকরা নতুন করে আশা বাঁধলেও তা এখন হতাশার রূপ নিয়েছে। বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ থাকায় মিলের কোটি কোটি টাকা মূল্যের মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও ভারী কলকব্জা মরিচা ধরে ও অকেজো হয়ে নষ্ট হচ্ছে। এক সময় এই সুগার মিলটি শত শত মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। এটি চালু থাকলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে শত শত শ্রমিক ও কর্মচারীর নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারত। আখচাষিরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পেতেন এবং আখ চাষে নতুন উদ্দীপনা ফিরত। এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক চাকা পুনরায় সচল হতে পারত।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক শ্রমিকদের দাবি, কেবল কাগজ-কলমে বা ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে দাশুড়িয়া সুগার মিলটি চালু করা হোক। এতে করে একদিকে যেমন সরকারের এই বিশাল ভর্তুকির অপচয় বন্ধ হবে, অন্যদিকে শত শত কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

ফরিদপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠন, সর্বহারা, দলের ক্যাম্প কমান্ডার বছির মল্লিক গ্রেফতার 

পাবনা সুগার মিল: বন্ধ কারখানায় মাসে অপচয় ১৪ লাখ টাকা, কাজ না করেই বেতন নিচ্ছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা । 

Update Time : 12:02:14 pm, Friday, 30 October 2026

পাবনা প্রতিনিধি

পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান হলো পাবনা চিনি কল লিমিটেড । এটি অবস্থিত পাবনা-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের পাকুড়িয়া মৌজার কালিকাপুরে । ১৯৯২ সালের ২৭ ডিসেম্বর সরকারি উদ্যোগে মিলটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৭ সালে এর প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হয়।

১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে এটি বাণিজ্যিকভাবে চিনি উৎপাদন শুরু করে। এর প্রধান যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ছিল পাকিস্তানের এইচএমসি লিমিটেড । বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশ আওতায় পাবনা সুগার মিলের মোট জমির পরিমাণ ৬০ একর এর মধ্যে কারখানা ২৭ একর, আবাসিক ও অন্যান্য ১৮ একর এবং রাস্তা ও লেগুন ১৫ একরের ওপর প্রতিষ্ঠিত । এই শিল্প কমপ্লেক্সের মধ্যে চিনিকল ছাড়াও বাণিজ্যিক খামার, জৈব সার কারখানা, অফিস এবং আবাসন ভবন রয়েছে। মিলটির দৈনিক আখ মাড়াইয়ের ক্ষমতা ১,৫০০ মেট্রিক টন। বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ছিলো ১৫,০০০ মেট্রিক টন চিনি। উৎপাদিত প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে চিনি। এ ছাড়া উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে চিটাগুড় ব্যাগাস ও প্রেসমাড উৎপাদিত হতো । পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঁচামাল বা আখের ঘাটতি, পুরনো যন্ত্রপাতি এবং নানা ধরনের আর্থিক লোকসানের কারণে ২০০৯ সালে মিলটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে মিল চালুর সুনির্দিষ্ট সময়ে স্থানীয় ইক্ষু চাষিদের আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করতে ঋণ প্রদান ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো ।

বারবার আশ্বাস আর ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে পাবনা সুগার মিল চালুর উদ্যোগ। ঐতিহ্যবাহী এই চিনি কলটি চালুর বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের একাধিক বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতির পর দীর্ঘদিন পার হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ফলে অনিশ্চয়তা আর হতাশার প্রহর গুণছেন আখচাষি ও হাজারো শ্রমিক-কর্মচারী।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে দীর্ঘদিন ধরে মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ থাকায় মিলের কোটি কোটি টাকা মূল্যের মূল্যবান যন্ত্রপাতি খোলা আকাশের নিচে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এতে রোদ-বৃষ্টিতে জমে থাকা ভারী যন্ত্রপাতিগুলোতে জং ধরে ধীরে ধীরে তা অকার্যকর হতে চলেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত এই চিনিকল চালু করা না হলে অথবা পড়ে থাকা সরকারি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও অহেতুক ব্যয় রোধ না করা হলে সরকারের এই বিশাল প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে ।

 

এক সময় যা ছিল ঈশ্বরদী ও দাশুড়িয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু, তা এখন এক নীরব ভূতুড়ে চত্বরে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় চাষিরা জানান, মিলটি বন্ধ হওয়ার পর তারা মারাত্মক আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন। চিনি কল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আখ চাষ ছেড়ে তারা বাধ্য হয়ে বিকল্প ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। তবে বিকল্প ফসলে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পাওয়ায় মিলটি পুনরায় চালু করার দাবি তাদের দীর্ঘদিনের।

পাবনা সুগার মিলের শ্রমিক নেতারা জানান বিভিন্ন সময়ে সুগার মিলটি চালুর আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো কাজ বা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। মিলটি চালু হলে এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ফিরত এবং স্থানীয় অর্থনীতি আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। কৃষিবিদ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সময়মতো সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর আধুনিকায়ন ছাড়া কেবল ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সুগার মিলটি পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে। মিলটি পুনরায় চালু করতে হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, আখচাষিদের প্রয়োজনীয় ঋণ ও প্রণোদনা দেওয়া এবং বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে চালুর কোনো বাস্তব পদক্ষেপ না থাকায় স্থানীয় আখচাষি, শ্রমিক ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা অনতিবিলম্বে কথা না দিয়ে কাজের মাধ্যমে দ্রুত পাবনা সুগার মিল সচল করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া দেশের বৃহৎ শিল্প-কারখানাগুলো পুনরায় চালুর নীতিগত ঘোষণা ও উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়ায় অবস্থিত পাবনা সুগার মিলস লিমিটেডের ভাগ্যে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। চালুর প্রতিশ্রুতি কেবল ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ায় ক্ষোভ ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণ। অন্যদিকে, মিলের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ থাকলেও প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাহারার নামে সরকারের কোষাগার থেকে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে।প্রতিষ্ঠানটি থেকে জানা যায়, চিনি উৎপাদন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও মিলের প্রশাসনিক ও রক্ষাণাবেক্ষণের কাজে বর্তমানে ২৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২৬ জন নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োজিত রয়েছেন। এই ৫২ জন জনবলের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে সরকারকে প্রায় ১৪ লক্ষ টাকা ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। কোনো আয় ছাড়া এভাবে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টিকে স্থানীয় সচেতন মহল অযৌক্তিক এবং সরকারি অর্থের অপচয় হিসেবে দেখছেন। এ ছাড়াও

স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিরাপত্তা প্রহরীর খাতায় নাম অন্তর্ভুক্ত রেখে কোনো দায়িত্ব পালন না করেই দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছেন তাদের স্থানীয় দলীয় পদ পদবী রয়েছে ।

নিরাপত্তা প্রহরীদের বেতন ও ভাতার বিষয়ে জানতে চাইলে পাবনা সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আখতারুজ্জামান জানান আমাদের নিরাপত্তা প্রহরীর সেবাটি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এইড সিকিউরিটি সার্ভিস (প্রাঃ) লিমিটেড, রাজশাহী’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোট ২৬ জন নিরাপত্তা প্রহরীর বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়ে থাকে। চুক্তি অনুযায়ী টাকা আমরা ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করি। এখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যদি স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে সিকিউরিটি ডিউটিতে রাখে বা তাদের বেতন দেয়, তার দায়ভার আমাদের নয়।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ‘এইড সিকিউরিটি সার্ভিস (প্রাঃ) লিমিটেড’-এর পরিচালক শাহিদ আলী শান্তর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। এ দিকে বন্ধ চিনিকলগুলো আধুনিকীকরণ ও পুনরুজ্জীবিত করার বিভিন্ন সময় ঘোষণা আসলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া সুগার মিলটিতে দেখা যায়নি। সরকারের উদ্যোগের কথা শুনে শ্রমিক ও কৃষকরা নতুন করে আশা বাঁধলেও তা এখন হতাশার রূপ নিয়েছে। বছরের পর বছর উৎপাদন বন্ধ থাকায় মিলের কোটি কোটি টাকা মূল্যের মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও ভারী কলকব্জা মরিচা ধরে ও অকেজো হয়ে নষ্ট হচ্ছে। এক সময় এই সুগার মিলটি শত শত মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল। এটি চালু থাকলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে শত শত শ্রমিক ও কর্মচারীর নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারত। আখচাষিরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পেতেন এবং আখ চাষে নতুন উদ্দীপনা ফিরত। এলাকার স্থানীয় ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক চাকা পুনরায় সচল হতে পারত।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক শ্রমিকদের দাবি, কেবল কাগজ-কলমে বা ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে দাশুড়িয়া সুগার মিলটি চালু করা হোক। এতে করে একদিকে যেমন সরকারের এই বিশাল ভর্তুকির অপচয় বন্ধ হবে, অন্যদিকে শত শত কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।