সরকারি পাটক্রয় কেন্দ্র দখলে ‘প্রভাবশালী সিন্ডিকেট’—ভাঙ্গুড়ায় রাষ্ট্রের জমিতে ব্যক্তিগত রাজত্ব!

  • Reporter Name
  • Update Time : ০১:২৯:১২ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • 225 Time View

ইজারার আড়ালে লুটপাট, যন্ত্রাংশ উধাও—প্রশাসন জানে, তবুও কার্যকর পদক্ষেপ নেই!
নিজস্ব প্রতিবেদক মো:গোলাম মোস্তফা
পাবনার ভাঙ্গুড়ায় বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের পাটক্রয় কেন্দ্র এখন আর রাষ্ট্রের সম্পদ নয়—এটি যেন প্রভাবশালী একটি চক্রের নিয়ন্ত্রিত ‘ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। সরকারি প্রায় সাড়ে তিন একর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে পাকা বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও! অভিযোগ রয়েছে, এই দখলবাণিজ্যের আড়ালে চলছে যন্ত্রাংশ বিক্রি ও জমি হাতবদলের গোপন কারবার।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চৌবাড়িয়া গ্রামের পাটক্রয় কেন্দ্রের প্রায় পুরো এলাকা দখল করে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে দখলদারদের অনেকেই তালা ঝুলিয়ে গা-ঢাকা দেন—যা পুরো ঘটনাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
ঐতিহ্যের জায়গায় দখলের থাবা
ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই পাটক্রয় কেন্দ্র একসময় চলনবিল অঞ্চলের কৃষকদের প্রধান ভরসা ছিল। স্বাধীনতার পরও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পাটকল বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে—আর তখনই শুরু হয় ‘দখল উৎসব’।
দখল, বেচাকেনা, হাতবদল—চলছে প্রকাশ্যেই
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহল ধাপে ধাপে জমি দখল করে প্লট আকারে বিক্রি করেছে। একাধিকবার হাতবদল হয়েছে এই সরকারি জমি।
জরিনা রহিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত আলী বসতি স্থাপনের কথা স্বীকার করলেও বৈধতার প্রশ্নে এড়িয়ে যান।
অন্যদিকে, কলেজ শিক্ষক মো. শামীম দীর্ঘদিন ভাড়া দেওয়ার দাবি করলেও কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালেও দখল!
দখলকৃত জমিতে চলছে মাদ্রাসা কার্যক্রম। মালিক গোলাম মোস্তফা প্রথমে জমি কেনার কথা বললেও পরে বক্তব্য পাল্টান।
ভাঙ্গুড়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজও একই জমিতে ভবন তুলেছে—তাদের দাবিকৃত লিজেরও নেই কোনো প্রমাণ।
যন্ত্রাংশ উধাও—কারা জড়িত?
স্থানীয় প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুল জলিলের অভিযোগ, রাতের আঁধারে পাটক্রয় কেন্দ্রের মূল্যবান যন্ত্রাংশ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জমি প্লট করে বিক্রি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
ইজারার আড়ালে প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড
ইজারাদার বিএম গোলজার হোসেন দাবি করেছেন, তিনি বৈধভাবে ২.১৯ একর জমি ইজারা নিয়েছেন। তবে চুক্তি অনুযায়ী অন্যকে ভাড়া দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি নীরবতা অবলম্বন করেন।
প্রশাসন জানে, তবুও নীরব কেন?
সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্বীকার করেছেন—ইজারার বাইরে অবৈধ দখল ও পাকা স্থাপনা রয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে।
জুট কর্পোরেশনও দখলের কথা স্বীকার করে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে।
সাধারণ জনগণের প্রশ্ন:
সরকারি জমি দখল হয়ে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ হয়ে যাচ্ছে—
তাহলে রাষ্ট্র কোথায়? প্রশাসন কি শুধুই দর্শক?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

সরকারি পাটক্রয় কেন্দ্র দখলে ‘প্রভাবশালী সিন্ডিকেট’—ভাঙ্গুড়ায় রাষ্ট্রের জমিতে ব্যক্তিগত রাজত্ব!

Update Time : ০১:২৯:১২ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

ইজারার আড়ালে লুটপাট, যন্ত্রাংশ উধাও—প্রশাসন জানে, তবুও কার্যকর পদক্ষেপ নেই!
নিজস্ব প্রতিবেদক মো:গোলাম মোস্তফা
পাবনার ভাঙ্গুড়ায় বাংলাদেশ জুট কর্পোরেশনের পাটক্রয় কেন্দ্র এখন আর রাষ্ট্রের সম্পদ নয়—এটি যেন প্রভাবশালী একটি চক্রের নিয়ন্ত্রিত ‘ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে’ পরিণত হয়েছে। সরকারি প্রায় সাড়ে তিন একর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে পাকা বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও! অভিযোগ রয়েছে, এই দখলবাণিজ্যের আড়ালে চলছে যন্ত্রাংশ বিক্রি ও জমি হাতবদলের গোপন কারবার।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চৌবাড়িয়া গ্রামের পাটক্রয় কেন্দ্রের প্রায় পুরো এলাকা দখল করে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে দখলদারদের অনেকেই তালা ঝুলিয়ে গা-ঢাকা দেন—যা পুরো ঘটনাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
ঐতিহ্যের জায়গায় দখলের থাবা
ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই পাটক্রয় কেন্দ্র একসময় চলনবিল অঞ্চলের কৃষকদের প্রধান ভরসা ছিল। স্বাধীনতার পরও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু পাটকল বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে—আর তখনই শুরু হয় ‘দখল উৎসব’।
দখল, বেচাকেনা, হাতবদল—চলছে প্রকাশ্যেই
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহল ধাপে ধাপে জমি দখল করে প্লট আকারে বিক্রি করেছে। একাধিকবার হাতবদল হয়েছে এই সরকারি জমি।
জরিনা রহিম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত আলী বসতি স্থাপনের কথা স্বীকার করলেও বৈধতার প্রশ্নে এড়িয়ে যান।
অন্যদিকে, কলেজ শিক্ষক মো. শামীম দীর্ঘদিন ভাড়া দেওয়ার দাবি করলেও কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালেও দখল!
দখলকৃত জমিতে চলছে মাদ্রাসা কার্যক্রম। মালিক গোলাম মোস্তফা প্রথমে জমি কেনার কথা বললেও পরে বক্তব্য পাল্টান।
ভাঙ্গুড়া মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজও একই জমিতে ভবন তুলেছে—তাদের দাবিকৃত লিজেরও নেই কোনো প্রমাণ।
যন্ত্রাংশ উধাও—কারা জড়িত?
স্থানীয় প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুল জলিলের অভিযোগ, রাতের আঁধারে পাটক্রয় কেন্দ্রের মূল্যবান যন্ত্রাংশ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জমি প্লট করে বিক্রি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
ইজারার আড়ালে প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড
ইজারাদার বিএম গোলজার হোসেন দাবি করেছেন, তিনি বৈধভাবে ২.১৯ একর জমি ইজারা নিয়েছেন। তবে চুক্তি অনুযায়ী অন্যকে ভাড়া দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও বাস্তবে তা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি নীরবতা অবলম্বন করেন।
প্রশাসন জানে, তবুও নীরব কেন?
সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্বীকার করেছেন—ইজারার বাইরে অবৈধ দখল ও পাকা স্থাপনা রয়েছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে।
জুট কর্পোরেশনও দখলের কথা স্বীকার করে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছে।
সাধারণ জনগণের প্রশ্ন:
সরকারি জমি দখল হয়ে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ হয়ে যাচ্ছে—
তাহলে রাষ্ট্র কোথায়? প্রশাসন কি শুধুই দর্শক?