
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা ইউনিয়নের মৃধাপাড়া-পাচুড়িয়া এলাকার মৃত এখলাস মোল্লার বড় মেয়ে শর্মিলা খাতুনকে কাবিননামা ও রেজিস্ট্রি ছাড়া বিয়ের মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্কে জড়ানোর পর এক কন্যাসন্তানের মা বানানো এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে একই উপজেলার বি-নগর ইউনিয়নের রুলদহ গ্রামের আব্দুল মোমিনের ছেলে ও ফরিদপুর উপজেলার পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জান্নাত হোসেনের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী শর্মিলা খাতুন বলেন, ২০২৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে জান্নাত হোসেনের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। আমাকে বারবার বলেছে কাবিননাম আছে বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়েছে আমিও সেইটাই জানি এবং বিশ্বাস করেছি। বিয়ের যে কাবিননামা নেই, বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়নি আমি এইটা জানতাম না। আজকেই সকল কিছু জানতে পারলাম। বিয়ের পর আমার একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। আমার এই কন্যা সন্তানের জন্ম বৈধ না কি অবৈধ এমন প্রশ্নের উত্তরে হতাশায় দিন পার করছে ভুক্তভোগী শর্মিলা।
শর্মিলা খাতুনের অভিযোগ, চলতি বছরের ২১ জুন সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে শ্বশুরবাড়িতে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি মোবাইল ফোনে তার মাকে বিষয়টি জানান। খবর পেয়ে তার মা দ্রুত সেখানে গিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করেন। শর্মিলার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে ফরিদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
চিকিৎসা শেষে এ ঘটনায় শর্মিলা খাতুন বাদী হয়ে পাবনার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৪, ফরিদপুর কোর্টে মামলা দায়ের করেন। মামলার নম্বর সিআর-১৭৭/২০২৬ (ফরিদপুর)। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (২০০৩ সালে সংশোধিত)-এর ১১(গ)/৩০ ধারায় দায়ের করা হয়েছে বলে মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে।
তবে বিয়েটি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রেজিস্ট্রি ও কাবিননামা হয়নি বলে স্বীকার করেছেন, জান্নাত হোসেন ও বিয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব আমিনুল হক সাবেরী। বিয়েতে উপস্থিত থেকে তিনিও স্বীকার করেন কাবিননামা হয় নাই ,বিয়ে রেজিস্টি হয় নাই।
তবে এক লাখ এক টাকা কাবিন ধার্য করা হয়েছিল কি না-এমন প্রশ্নের উত্তরে জান্নাত হোসেন বলেন, বিয়ের তো কোনো কাবিনই করা হয়নি, অর্থাৎ রেজিস্ট্রি হয়নি। কোর্ট ফি করা আছে একটা। প্রশ্ন উঠেছে এখানেও কোর্ট ফি বিয়ের কোন বৈধ লাইসেন্স হতে পারে কি?
বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়নি, এ কথা পুনরায় নিশ্চিত করে তিনি আবারো বলেন, রেজিস্ট্রি না হওয়ার বিষয়টি আমিনুল হক সাবেরী ভালো বলতে পারবেন, কারণ তিনিই বিয়ের বিষয়টি দেখেছিলেন।
বিবাহ বন্ধন বাংলাদেশ সরকারের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে জান্নাত হোসেন বলেন, এই বিয়ে বৈধতা পাবে না।
এ পর্যায়ে দীর্ঘদিনের দাম্পত্য সম্পর্কের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করলে জান্নাত হোসেন জানান, তিনি বিষয়টি আমিনুল হক সাবেরীকে জানিয়েছিলেন। তার দাবি, সাবেরী তাকে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা না করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
‘রেজিস্ট্রি হয়নি, কাবিননামাও নেই’ এ বিষয়ে ফরিদপুর উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব আমিনুল হক সাবেরী বলেন, “বিয়ে দেওয়ার সময় আমি তো ছিলাম, জানি সব।”
সরকারি বিধি অনুযায়ী বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, না, রেজিস্ট্রি হয়নি। কোর্ট ম্যারেজের একটা কাগজ হয়েছিল শুধু। কোর্ট ম্যারেজ কাগজ কি বৈধ বিয়েতে রুপান্তর করতে পারে যদি কোর্ট ম্যারেজের কাগজই বৈধ হতো তাহলে সরকারের বিধি বিধানের কি প্রয়োজন ছিলো এমন প্রশ্ন উঠেছে জনমনে।
বিবাহটি আইনগতভাবে সম্পন্ন হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্ন করলে তিনি সম্মতি জানিয়ে বলেন, ছেলে পক্ষ বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করছে না তো এবং তাদের সন্তানও হয়েছে।
বিবাহের কোনো লিখিত প্রমাণ রয়েছে কি না জানতে চাইলে আমিনুল হক সাবেরী বলেন, কাবিননামা তো নেই।
‘কোর্ট ম্যারেজ’ বলতে সাধারণভাবে কী বোঝায়, এ নিয়েও অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, অনেকেই মনে করেন আদালতে কোনো এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সরাসরি বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি সব ক্ষেত্রে এমন নয়।
অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম দম্পতি কাজির মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন ও নিবন্ধন করার পর সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা বা ঘোষণাপত্র হিসেবে সম্পাদন করেন। সাধারণভাবে এ ধরনের প্রক্রিয়াকেও অনেকে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ বলে থাকেন।
তবে শুধু নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে হলফনামা বা ঘোষণাপত্র সম্পাদন করলেই মুসলিম বিবাহের সরকারি নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিয়ের আইনগত অবস্থান নির্ভর করে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন ও নিবন্ধনের ওপর।
তাই ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে কোনো কাগজপত্র থাকলেই সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ বিবাহের সরকারি প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যাবে কি না, তা কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া যাচাই করে নির্ধারণ করতে হবে।
ভুক্তভোগী শর্মিলা খাতুন বিবাহ অস্পষ্ট থাকা জেনে অভিযোগ করে বলেন, বিয়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন তাকে স্ত্রী হিসেবে রাখা হয়েছে এবং একপর্যায়ে তিনি শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারিক কার্যক্রমের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
প্রশ্ন উঠেছে, রেজিস্ট্রি ও কাবিননামা ছাড়া সরকারি বিধি অনুযায়ী কোনো বিবাহ বৈধ হয় কি না, এমন প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলছে স্থানীয়দের।
আরও প্রশ্ন উঠেছে, কাবিননামা ও বিবাহের সরকারি নিবন্ধন না থাকলে পরবর্তীতে দাম্পত্য জীবনে কোনো ধরনের গড়মিল বা বিরোধ সৃষ্টি হলে আইনগতভাবে কীভাবে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন হবে, এ নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এ প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর মিলছে না। সময়ের সঙ্গে বিষয়টি ভাবিয়ে তুলছে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে। আবার কেউ কেউ বলছে এই বিয়ে কি আসলেই হয়েছে না কি বিয়ে করার নামে প্রতারণার এক কঠিন ফাঁদ পেতে মানুষের জীবনকে নষ্টের পথে ধাবিত করা হচ্ছে। একটা নারী কেন কি কারণে পতিতা, যৌনপল্লীতে গিয়ে অবস্থান করে এমন বিয়ের গল্প-কাহিনী না শুনলে কিছুই বোঝা যাবে না।
মুসলিম সম্প্রদায়ের বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ও নিয়োজিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজির মাধ্যমে সরকারি ফরম পূরণ করে তা রেজিস্ট্রি করতে হয়।
বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রি মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিম বিবাহ সরকার কর্তৃক লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করতে হবে। সাক্ষী সম্পন্ন করার সময় ন্যূনতম দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে। দেনমোহর আইনি বিধান অনুযায়ী দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করে কাবিননামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
Reporter Name 


















