পাবনা প্রতিনিধিঃ
বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন, আকর্ষণীয় বেতনে চাকরির প্রতিশ্রুতি, বৈধ ভিসা প্রসেসিংয়ের আশ্বাস, সবকিছুই শুরু হয় বিশ্বাস অর্জনের মাধ্যমে। কিন্তু সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করে কেউ যদি মানুষকে বিপজ্জনক পথে বিদেশে পাঠায়, পরে বন্দী করে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সেটি আর সাধারণ প্রতারণার বিষয় থাকে না; মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের গুরুতর আশঙ্কা তৈরি হয়।
বাংলাদেশ থেকে গ্রিসে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে লিবিয়াতে পাঠিয়ে তথাকথিত ‘গেমঘর’ বা আটকস্থলে বন্দী রেখে গ্রিসে না পাঠিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার নতুন ফাঁদ বের করেছে এই চক্রের সদস্যরা। পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা এবং নির্যাতনের ভয় দেখানোর মতো ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এমন চিত্র ধরা পরেছে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আতাইকুলা থানাধীন ভুলবাড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর পূর্বপাড়া এলাকার ইউসুফ প্রামানিকের জামাতা সোহেল (৩৭), তাঁর স্ত্রী মঞ্জিলা এবং শ্বশুর ইউসুফ প্রামানিককে ঘিরে মানবপাচার-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে বলে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বৈধ প্রক্রিয়ায় ভিসা, নিয়োগকর্তার তথ্য, কাজের অনুমতি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অসাধু মধ্যস্থতাকারীরা কখনো কখনো বিদেশে চাকরির নিশ্চয়তা, দ্রুত ভিসা, বেশি বেতন কিংবা অল্প সময়ে ভাগ্য পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন।
মানবপাচার-সংশ্লিষ্ট কিছু ঘটনায় ভুক্তভোগীদের তথাকথিত ‘গেমঘর’ বা গোপন আটকস্থলে আটকে রাখার অভিযোগ পাওয়া যায়। সেখানে তাঁদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে না দেওয়া, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মুক্তির বিনিময়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।
মানবপাচার-সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বিদেশে আটকা পড়লে তাঁর পরিবারও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের কাছে ফোন করে টাকা দাবি, অর্থ না দিলে ক্ষতি করার ভয় দেখানো কিংবা আরও অর্থ পাঠাতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় জমিজমা বিক্রি, ঋণ গ্রহণ কিংবা সঞ্চয় ভেঙে অর্থ পাঠাতে বাধ্য হন বলে বিভিন্ন ঘটনায় অভিযোগ উঠে এসেছে। কিন্তু টাকা পাঠানোর পরও ভুক্তভোগী মুক্তি পাবেন কি না, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যায়। কোনো ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানোর নামে অর্থ নেওয়া এবং পরে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে অর্থ দাবি করার অভিযোগ উঠলে লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য, অর্থগ্রহণকারীর পরিচয়, সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ এবং বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র তদন্ত করা জরুরি।
মানবপাচারের অভিযোগ সামনে এলে সংশ্লিষ্ট থানা, অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানবপাচারবিরোধী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো অভিযোগ গ্রহণ, তথ্য যাচাই, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং আইন অনুযায়ী তদন্ত করা। মানবপাচার প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও মানবপাচারের ঝুঁকি কমাতে বিদেশগামী কর্মীদের নিয়োগকর্তা, ভিসা, চুক্তিপত্র এবং বৈধ অভিবাসনপথ যাচাইয়ের বিষয়ে সচেতন করা জরুরি।
বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখা অপরাধ নয়। পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন এবং নিরাপদ কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে যাওয়া মানুষের অধিকার। কিন্তু সেই স্বপ্নকে পুঁজি করে কাউকে প্রতারণা, শোষণ, জবরদস্তি কিংবা বন্দিত্বের মুখে ঠেলে দেওয়া হলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
পাবনার সাঁথিয়ার ভবানীপুর পূর্বপাড়া এলাকার ব্যক্তিদের ঘিরে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত সত্য কী, বিদেশে পাঠানোর নামে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, লিবিয়ায় কাউকে আটকে রাখার অভিযোগের সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নির্ভর করছে যাচাইযোগ্য তথ্য ও তদন্তের ওপর।
এই চক্রের একজন সদস্য পাবনা থেকে পাঠানো ইউসুফ প্রামানিক স্বীকার বলেন, আমরা বিদেশে মানূষ পাঠিয়েছি। এই চক্রের মূল সদস্য সোহেল লিবিয়াতে অবস্থান করার কারণে যোগাযোগ করা যায় নাই।
মানবপাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নিতে হলে প্রয়োজন ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি। কোনো পরিবার যেন প্রিয়জনকে বিদেশে পাঠিয়ে প্রতারণা, অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্বের মধ্যে না পড়ে, এটাই হওয়া উচিত মানবপাচারবিরোধী উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এই সকল বিদেশ পাঠানো এবং অন্য উপায়ে আবারো বাংলাদেশে টাকার মাধ্যমে ফিরিয়ে দেওয়া চক্রের মানুষ গুলোকে আইনের আওতায় আনতে হবে এমনটা প্রত্যাশা করেন স্থানীয়রা।