বিকাশ কুমার দাস
স্টাফ রিপোর্টার
পাবনার চাটমোহরে নিজস্ব কৃষিজমি নেই, তবু কৃষিকে ঘিরেই স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন গৃহবধূ শারমিন খাতুন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অন্যের জমি পাঁচ বছরের জন্য লিজ নিয়ে শুরু করেন মাল্টা চাষ। শুরুতে সামাজিক বাধা, মানুষের বিরূপ মন্তব্য ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এখন তাঁর বাগানে দুলছে সবুজ মাল্টা। বাড়ছে আয়ের সম্ভাবনা, আর তাঁর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন এলাকার অন্য কৃষক ও উদ্যোক্তারাও।
পাবনার চাটমোহর উপজেলার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের এই নারী উদ্যোক্তা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘মাল্টা ভাবি’ নামে। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি, পরিশ্রম ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ কাজে লাগিয়ে তিনি প্রমাণ করছেন, নিজস্ব জমি না থাকলেও পরিকল্পিত উদ্যোগে কৃষিকে ঘিরে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব।
২০২৩ সালের শেষদিকে দুই বিঘা জমি পাঁচ বছরের জন্য লিজ নিয়ে মাল্টা চাষ শুরু করেন শারমিন। বাগানে রোপণ করেন ভিয়েতনামি ও বারি-১ জাতের মাল্টার চারা। শুরুর দিকে ফলন কম থাকলেও সময়ের সঙ্গে গাছগুলো বেড়ে ওঠে এবং ফল দিতে শুরু করে। বর্তমানে বাগানের গাছে গাছে ঝুলছে সবুজ মাল্টা। ফলের আকার, স্বাদ ও মান নিয়েও সন্তুষ্ট তিনি।
শারমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, জমি লিজ, পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে গত বছর দুই লাখ টাকার বেশি লাভ হয়েছে। চলতি মৌসুমে সব খরচ বাদে প্রায় চার লাখ টাকা মুনাফার প্রত্যাশা করছেন তিনি। তাঁর আশা, ফলন ও বাজারজাতকরণে অনুকূল পরিস্থিতি থাকলে ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
সামাজিক বাধা পেরিয়ে এগিয়ে চলা
শারমিনের মাল্টাবাগানটি রেললাইনের পাশের তুলনামূলক দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা থাকলেও তাঁর উদ্যোগের কথা ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের গ্রামগুলোতে। প্রতিদিনই বাগান দেখতে, মাল্টা কিনতে এবং চাষের পদ্ধতি জানতে সেখানে আসছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ জানতে চাইছেন চারা রোপণ ও পরিচর্যার কৌশল, আবার কেউ হিসাব কষছেন এই ফল চাষে লাভের সম্ভাবনা নিয়ে।
শারমিন খাতুন জানান, তাঁদের এলাকায় সাধারণত ধান, সরিষা ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের চাষ হয়ে থাকে। প্রচলিত চাষাবাদের বাইরে গিয়ে মাল্টা চাষের উদ্যোগ নেওয়ায় শুরুতে অনেকের কাছ থেকেই বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়েছে তাঁকে। তবে সেসব কথায় কান না দিয়ে নিজের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চালিয়ে গেছেন। এখন বাগানের ফলন ও আয়ের সম্ভাবনা দেখে অনেকেই তাঁর উদ্যোগের প্রশংসা করছেন।
তিনি বলেন, স্থানীয় বাজারে সবুজ মাল্টার দাম ও চাহিদা নিয়ে কিছুটা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ কারণে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সম্ভাবনা বাড়াতে নতুন করে এক বিঘা জমিতে অস্ট্রেলীয় হলুদ জাতের মাল্টা চাষ শুরু করেছেন। নতুন জাতের মাল্টা বাজারে ভালো সাড়া ফেলবে এবং ব্যবসার পরিধি বাড়াতে সহায়তা করবে বলে আশা করছেন তিনি।
বাগান দেখতে এসে আগ্রহী হচ্ছেন অন্যরাও
চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া থেকে বাগান দেখতে আসা আনিসুল হক ও রায়হান আলী জানান, শারমিনের মাল্টা চাষের কথা শুনে তাঁরা বাগানটি দেখতে এসেছেন। গাছের ফলন ও চাষের পরিবেশ দেখে তাঁরা উৎসাহিত হয়েছেন। তাঁদের মতে, এলাকার অনাবাদি বা পতিত জমিতে লাভজনক ফল চাষের সুযোগ থাকলে ভবিষ্যতে তাঁরাও মাল্টা চাষের উদ্যোগ নিতে পারেন।
শারমিনের বাগান এখন শুধু ফল উৎপাদন ও আয়ের ক্ষেত্র নয়, বরং কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা খুঁজছেন এমন মানুষের জন্য শেখারও একটি জায়গা হয়ে উঠছে। তাঁর উদ্যোগ দেখে অন্যরা বিকল্প ফসল চাষের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শে এগিয়ে চলা
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও শারমিনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। কামালপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, মাল্টা চাষ শুরুর পর থেকেই শারমিনকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি প্রযুক্তি ও বাগানের পরিচর্যা সম্পর্কে তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাইদুর রহমান সাঈদ জানান, ভিয়েতনামি জাতের মাল্টা সুস্বাদু ও রসালো হওয়ায় এ জাতের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। উপযুক্ত পরিচর্যা, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করা গেলে এ ধরনের ফল চাষে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ কুন্তলা জানান, শারমিন খাতুনের মতো আগ্রহী ও পরিশ্রমী উদ্যোক্তাদের কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় ফল মেলায় তাঁর বাগানের মাল্টা প্রদর্শনের পর এলাকার আরও অনেক কৃষক এ ফল চাষে আগ্রহ দেখিয়েছেন। ভবিষ্যতে চাটমোহরে মাল্টার আবাদ বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার অনুপ্রেরণা
সীমিত সম্পদ, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও বাজারের চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে শারমিন খাতুনের এই উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের একটি ইতিবাচক উদাহরণ। নিজস্ব জমি না থাকলেও অন্যের জমি লিজ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ফল চাষের মাধ্যমে তিনি নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছেন।
তাঁর এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত আয়ের সম্ভাবনাই তৈরি করেনি, বরং এলাকার অন্য নারীদেরও কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণে উৎসাহিত করছে। সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি ও বাজারজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে শারমিনের মতো উদ্যোক্তারা গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছবি: পাবনার চাটমোহরে লিজ নেওয়া জমিতে গড়ে তোলা মাল্টাবাগানে ফল দেখাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তা শারমিন খাতুন। তাঁর উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন এলাকার অন্য কৃষকেরা।